নৃগোষ্ঠী কাকে বলে | নৃগোষ্ঠী বৈশিষ্ট্য

নৃগোষ্ঠীর কাকে বলে ? মানব জাতির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর। নিচে আমরা আজকে নৃগোষ্ঠী কাকে বলে, কতো প্রকার এবং কিকি এবং নৃগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করবো।

একটি এলাকার মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার নৃতাত্ত্বিক গঠনের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে। নরগোষ্ঠীগত শুদ্ধতা ও মিশ্রতা সেই জাতির ইতিহাসের অংশ। তাই একটি এলাকার মানুষের ইতিহাস জানতে অধিবাসীদের নৃতাত্ত্বিক গঠন জানা অপরিহার্য। নৃতাত্ত্বিক গঠন বা নরগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য হলো একজন মানুষের তথা জাতির আহ্যিক দৈহিক অবয়ব। অর্থাৎ বিশ্বের মানুষগুলোকে তাদের দৈহিক গঠন বিবেচনায় কতকগুলো ভাগে ভাগ করা হয়েছে যার প্রতিটি ভাগকে বলা হয় নরগোষ্ঠী বা নৃগোষ্ঠী বা Race। এই দৈহিক বৈশিষ্ট্য মানুষ উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করে।

নৃগোষ্ঠী কাকে বলে?

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে অনেক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাঁদের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলো

সমাজবিজ্ঞানী Jon M. Shepard তাঁর ‘Sociology’ গ্রন্থে Race এর সংজ্ঞায় বলেন, “Race is a distinct category of people who share certain biologically inherited physical characteristics” অর্থাৎ, নৃগোষ্ঠী হচ্ছে জনসংখ্যার সেই এক বিশেষ অংশ যারা জৈবিক উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কতকগুলো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

সমাজবিজ্ঞানী Schaefer তাঁর ‘Sociology’ গ্রন্থে Race এর সংজ্ঞায় বলেন, “Race is a group which is set apart from others because of obvious physical difference.” অর্থাৎ, নৃগোষ্ঠী বলতে এমন একটি গোষ্ঠীকে বুঝায় যারা সুস্পষ্ট দৈহিক পার্থক্যের কারণে অন্যান্যদের থেকে পৃথক।

সমাজবিজ্ঞানী E. B. Tylor তাঁর Dictionary of Anthropology’ গ্রন্থে বলেন, “Race is a major division of mankind with distinctive hereditarily transmissible physical chahracteristics.” 

অর্থাৎ, নৃগোষ্ঠী হচ্ছে মানব জাতির একটি প্রধান বিভাগ যার রয়েছে উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তায় এমন নির্দিষ্ট দৈহিক বৈশিষ্ট্যাবলি।

যেসব বৈশিষ্ট্যে ভিত্তিতে নৃগোষ্ঠীর শ্রেণিবিভাগ করা হয় সেগুলো হলো মাথার গড়ন, মুখাকৃতি, গায়ে লোমের পরিমাণ, ঠোঁট ও নাকের গড়ন, দেহের উচ্চতা, ওজন, দাড়ি ও চুলের রং, ঘনত্ব ও গড়ন প্রকৃতি, চামড়ার রং, চোখের মণির রং ও আকৃতি, কান ইত্যাদি।

উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সমগ্র মানবজাতিকে প্রধানত চারভাগে ভাগ করা যায়। যথা: 

১। ককেশয়েড বা শ্বেতকায় (Caucasoid), ২। নিগ্রোয়েড বা কৃষ্ণকায় (Negroid), 

৩। মঙ্গোলয়েড বা বাদামী বা মঙ্গোলীয় (Mongoloid) এবং 

৪ । অস্ট্রালয়েড বা আদি অস্ট্রেলীয় (Australoid)।

মানব জাতির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য : দৈহিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পার্থক্য এবং বৈশিষ্ট্য নিম্নে দেয়া হলো :

১. মাথার গড়ন : ককেশয়েড, নিগ্রো মাথা লম্বা। অস্ট্রালয়েডদের মাথার গড়ন লম্বাটে ও মাঝারি, পক্ষান্তরে মঙ্গোলীয়দের মাথা চওড়া ও গোল।

২. মুখাকৃতি : ককেশয়েডদের মুখাকৃতি লম্বাটে ও সরু, নিপ্লোয়েডদের মুখাকৃতি লম্বাটে তবে ককেশয়েডদের মতো অতটা সরু নয়, অস্ট্রালয়েডদের মুখাকৃতি দেহের তুলনায় বড়, চোয়াল চওড়া, থুডনী ছোট, আর মঙ্গোলয়েডদের মুখাকৃতি গোল, চওড়া ও ভাসা ভাসা সমতল ধরনের।

৩. নাকের গড়ন : ককেশয়েডদের নাক চিকন ও উঁচু, পক্ষান্তরে নিম্নোদের, অস্ট্রালয়েডদের থ্যাবড়া ও বোঁচা, মঙ্গোলয়েডদের মধ্যমাকৃতির। ককেশয়েডদের চোখের রং হাল্কা থেকে বাদামি কালো এবং চোখের মনি নীল। নিম্নোদের,

অস্ট্রালয়েডদের ও মঙ্গোলীয়দের কালো-বাদামি থেকে কালো। তবে অস্ট্রালয়েডদের অক্ষিপটের উপরের অংশ বড় এবং

মঙ্গোলীয়দের চোখের পাতা একটু বেশি মোটা এবং চোখের আকার অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র।

৫. ঠোঁট : ককেশয়েডদের ঠোঁট পাতলা, মঙ্গোলীয়দের মাঝারি, নিগ্রো ও অস্ট্রালয়েডদের মোটা ও পুরু। ৬. কান: ককেশয়েডদের কান মাঝারি ধরনের লম্বা ও প্রশস্ত, নিগ্রোদের ও অস্ট্রালয়েডদের কান ছোট ও প্রশস্ত, মঙ্গোলীয়দের কান লম্বা ও সরু।

৭. গায়ের রং ককেশয়েডদের গায়ের রং সাদা ও সাদা-লালচে, মঙ্গোলয়েডদের বাদামি ও হলুদ ধরনের, নিগ্রো ও অস্ট্রালয়েডদের কালো।

৮. মাথার চুল ককেশয়েডদেও চুলের রং বাদামি ও সোনালি এবং চুল চিকন ও মোটা সোজা ধরনের, নিগ্রোদের ও চুল কালো থেকে কালো বাদামি, চুল মোটা ও কোকড়ানো, অস্ট্রালয়েডদের চুল কালো এবং পাতলা ধরনের সোজা ও কোঁকড়া, মঙ্গোলয়েডদের চুল প্রধানত কালো ও কালো বাদামি ধরনের তবে চুলগুলো মোটা ও খাড়া।

৯. গায়ের লোম ককেশয়েডদের গায়ে লোম ও মুখে দাড়ির প্রাচুর্য রয়েছে, নিগ্রোদের ও অস্ট্রালয়েডদের গায়ে প্রচুর লোম আছে তবে মুখে দাড়ির পরিমাণ কম, মঙ্গোলয়েডদের গায়ে ও মুখে দাড়ির পরিমাণ কম। 

১০. উচ্চতা ও দেহের গড়ন ককেশয়েডদের দেহের গড়ন বলিষ্ঠ, শক্তিশালী ও লম্বা, নিগ্রোদের দেহের গড়ন শঙ্ক

ও বলিষ্ঠ, উচ্চতা মাঝারি ও লম্বা, অস্ট্রালয়েডদের দেহের গড়ন শক্ত, উচ্চতা খর্বাকৃতি ধরনের, মঙ্গোলীয়দের দেহের গড়ন বলিষ্ঠ তবে উচ্চতা মাঝারি ধরনের।

শেষকথা

পরিশেষে বলা যায় যে, পরবর্তী রক্তধারার সাথে যুক্ত হয়েছে ভাষা, ধর্ম, যুদ্ধবিগ্রহ, সাহিত্য সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং মানসিক বা ভাবগত ঐক্যানুভূতি। এসব মিলিয়ে একটি জনপদ যে সত্তায় ভূষিত হয়-তাই তার জাতিসত্তা। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক গঠন শঙ্কর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *